বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ফলত বেগম জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বিশ্বের ইতিহাসে একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছিল যা পরবর্তী কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছিল। তিনি দেশকে বৈদেশিক সাহায্য নির্ভরতা থেকে বের করে এনেছিলেন। উল্লেখ্য, এরশাদ সরকারের শেষ বছরে বাংলাদেশ পুরোপুরি বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তার বিশ্বস্ত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান বাংলাদেশের economy-কে চাঙা করতে এবং জাতির সমৃদ্ধি আনতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ফলস্বরূপ, ১৯৯০ দশকের শুরুর দিকে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল যখন সাইফুর রহমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর জোর দিয়েছিলেন।
বেগম জিয়ার অধীনে ভ্যাট ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বৈদেশিক সাহায্য নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। এছাড়া, বেগম জিয়ার প্রথম শাসনামলে, বাংলাদেশের জিডিপি বছরে গড়ে ৪.৫% হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা এরশাদের আমলে ৩.৬% ছিল।
বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ১৯৯৩, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন ১৯৯৩ ইত্যাদি সহ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বেশ কয়েকটি আইন প্রণয়ন করে। এছাড়াও, তার শাসনামলে বেসরকারীকরণের বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জন্য প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই পদক্ষেপগুলি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্নিশ্চিত করতে সহায়ক ছিল।
নারীদেরকে শিক্ষা গ্রহণে এবং পরিবারগুলোকে তাঁদের মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর জন্য আগ্রহী করতে ১৯৯৪ সালের জানুয়ারি মাসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয় এবং ছাত্রীদের দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়।
সে বছর সরকার চারটি প্রকল্প হাতে নেয়। সেগুলো হলো মহিলা মাধ্যমিক স্কুল সহায়তা প্রকল্প ২, মহিলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রকল্প, মাধ্যমিক শিক্ষা খাত উন্নয়ন প্রকল্প ও মহিলা মাধ্যমিক শিক্ষা বৃত্তি প্রকল্প।
এছাড়া ১৯৯৩ সাল থেকে বেগম জিয়ার সরকার শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচী চালু করে যা ধীরে ধীরে ১২৫৫টি ইউনিয়নে সম্প্রসারণ করা হয় ১৯৯৬ সাল নাগাদ। ২০০১ সালে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচীর সহায়তায় পুরো দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়।
উল্লেখ্য ১৯৯১ সালে বেগম জিয়া যখন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তখন দেশের স্কুলগুলোতে ছাত্র ও ছাত্রীদের অনুপাত ছিল ৫৫ঃ৪৫, তিনি যখন ১৯৯৬ সালে মেয়াদ শেষ করেন তখন এই অনুপাত দাঁড়ায় ৫২ঃ৪৮। এছাড়া ১৯৯০ সালে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর তালিকাভুক্তির সংখ্যা ছিল ১২০ লক্ষের মত, যার মধ্যে প্রায় ৫৪ লক্ষ ছিল ছাত্রী। ১৯৯৬ সালে মোট তালিকাভুক্তি বেড়ে হয় ১৭৬ লক্ষের মত যার মধ্যে প্রায় ৮৪ লক্ষ ছিল ছাত্রী। অর্থাৎ পাঁচ বছরে প্রাথমিক পর্যায়ে ছাত্রীদের তালিকাভুক্তি বাড়ে প্রায় ৩০ লক্ষ।
১৯৯৩ সালের অক্টোবর মাসে দি নিউ ইয়র্ক টাইমস বেগম জিয়ার উদ্যোগ সম্পর্কে লিখেছিল, ‘Now as Prime Minister, Mrs. Zia -- in contrast with Benazir Bhutto when she first became Prime Minister of Pakistan -- is aggressively promoting education and vocational specially of girls.'
বিআইডিএস প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে ১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে কর্মসংস্থান বেড়ে ২৯%। পরের দশ বছরে এই কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার দুই অঙ্কের ঘরেও পৌঁছাতে পারেনি। বেগম জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী হন তখন দেশে মোট তৈরি পোশাক কারখানা ছিল ৮৩৪টি, ১৯৯৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২,৩৫৩টিতে, অর্থাৎ এই শিল্পের কলেবর বাড়ে প্রায় তিনগুণ। এসময় এই খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রার আয়ও বাড়ে প্রায় সাড়ে তিনগুণ।
পরিবেশ রক্ষায় বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদক্ষেপের মধ্যে ছিল ১৯৯২ সালে প্রথম জাতীয় পরিবেশ নীতি প্রণয়ন, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ প্রণয়ন ইত্যাদি।
১৯৯১ সালে বিএনপির সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই মায়ানমারে শুরু হয় রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ যার ফলে কক্সবাজার সীমান্ত থেকে প্রায় ২ লক্ষ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বেগম জিয়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেন এবং দ্রুতই তাঁদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর ব্যাপারে পদক্ষেপ নেন।
বাংলাদেশ এই সময় কোন তৃতীয় পক্ষ বা দেশের ভরসায় না থেকে বিষয়টিকে সরাসরি আন্তর্জাতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে জাতিসংঘের মাধ্যমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবসনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরেন। ১৯৯২ সালের মার্চে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে বেগম জিয়া যখন হোয়াইট হাউজে যান সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে মায়ানমার ও তার মিত্রদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে বলেন এবং জানান তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন। রাষ্ট্রপতি বুশ তাঁকে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি এই ব্যাপারে মায়ানমারের মিত্র আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে কাজ করবেন।
এসময় মায়ানমার সেনাবাহিনীর আচরণ ছিল ঔদ্ধত্যপূর্ণ এবং তারা বাংলাদেশের সীমান্তেও হামলা চালায় একবার। পালটা পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশও মায়ানমার সীমান্তে সেনাবাহিনীর অবস্থান জোরদার করে।
বেগম জিয়ার উদ্যোগে দ্রুত ফল হয়। ১৯৯৩ সালে ৫ নভেম্বর জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের সাথে মায়ানমার সরকার একটি চুক্তি করতে বাধ্য হয় এবং ২,২৯,৪৮৩ জন শরণার্থীকে ফিরিয়ে নেয়।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশে যখন এ যাবতকালের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় গোর্কি আঘাত হানে, তখন বেগম জিয়ার সরকারের ক্ষমতা নেয়ার দুই মাসও অতিবাহিত হয়নি। বাংলাদেশের দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতের অবস্থা ছিল তখন শোচনীয় এবং সমন্বয় বলতে কিছু ছিল না।
ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানার পর বেগম খালেদা জিয়া উপকূলীয় জেলাগুলোতে উদ্ধারকাজে অংশ নেন এবং تদারকিতে যুক্ত হন। তাঁর আহ্বানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান ও জাপানের সেনাবাহিনীর সদস্যরাও এই উদ্ধারকাজে সহায়তা করে। শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ সামরিক দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রচেষ্টা অপারেশন সি অ্যানজেল। পরবর্তীতে জাপান সরকার ক্ষতিগ্রস্ত জনপদ পুনর্গঠনে সহায়তা দেয়।
১৯৯১ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বেগম জিয়ার সরকার ১৯৯৩ সালে উপকূলীয় সবুজবেষ্টনী গড়ে তোলার প্রকল্প হাতে নেয়। ১৯৯৫ সালের ২রা মার্চ এটি এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক কর্তৃক অনুমোদিত হয়। ঋণ বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এপ্রিল মাসের ১৮ তারিখে। এই সবুজবেষ্টনী পরবর্তীতে বাংলাদেশকে বহু ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত প্রশমনে সাহায্য করেছে যা এখন উপকূলজুড়ে গড়ে ওঠা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।